ধর্মীয় ক্ষেত্রে আরবি পরিভাষা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা
আরবি পরিভাষা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা
ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় ফারসি ভাষার ব্যাপক প্রভাব
রয়েছে। আরবি এবং ফারসি শব্দের উচ্চারণের ভিন্নতা থাকায় কুরআন মাজিদে আমরা
একটি শব্দকে একভাবে উচ্চারণ করছি আর বাংলা ভাষায় এটিকে অন্য উচ্চারণে
পড়ছি। যার কারণে অনেকে বুঝতেই পারেন না যে শব্দটি কোরআন মাজিদে রয়েছে এবং এটি আরবি শব্দ। ধর্মীয় ক্ষেত্রে আরবি পরিভাষা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আজকে বিস্তারিত আলোচনা করব ইং শা আল্লাহ।
আমি কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন কোরআন মাজিদে আমরা পড়ি 'হাদির' অর্থাৎ উপস্থিত কিন্তু বাংলায় আমরা উচ্চারণ করি হাজির যেমন বলি 'হাজীরা খাতা'। আবার ফার্সিতে আমরা বলি 'কাজী' আরবিতে হচ্ছে 'ক্বাদি' যিনি বিচার করেন অর্থাৎ উচ্চারণ পরিবর্তন হয়ে যায়। আরবি বর্ণমালার মাত্র ১১ টি বর্ণের উচ্চারণ বাংলায় লিখা সম্ভব, বাকি হরফের উচ্চারণ বাংলায় লিখা সম্ভব নয়। তাদের মধ্যে একটি বর্ণ হচ্ছে ض যাকে আমরা বাংলায় দোয়াত হিসেবে লিখি। এর উচ্চারণ করি দ হিসাবে। বাংলাদেশে আরবি গ্রামার শিখানো হয় যে সকল বই থেকে সেই সকল অধিকাংশ বই ফারসি এবং উর্দু ভাষায় লেখা। তো ফার্সি ভাষায় দোয়াতের উচ্চারণ করা হয় জ সেই ফারসি ভাষাকে অনেকে আরবি উচ্চারণের সাথে মিলিয়ে ফেলেন। সে কারণেই সমস্যাগুলো তৈরি হয়। আরবরা বিশেষ করে সৌদি আরবে দোয়াতের উচ্চারণ করা হয় দ সেজন্য পড়া হয় দুয়াল্লিন কিন্তু ফারসি ভাষায় যেহেতু দোয়াতের উচ্চারণ করা হয় 'জ' সেজন্য যারা ফারসি উচ্চারণে অভ্যস্ত তারা পড়েন 'জুয়াল্লিন' । একসময় মানুষ না বুঝে দুয়াল্লিন- যুয়াল্লিন নিয়ে তর্কাতর্কি এমনকি মারামারি পর্যন্ত করত কিন্তু যখন মানুষ এ বিষয়টা জানতে পেরেছে তখন সবাই 'দুয়াল্লিন' মেনে নিয়েছে। এখন সবাই দুয়াল্লিন পড়েন কেউ কোনো আপত্তি করেন না কারণ আরবি শিখতে হবে আরবদের কাছ থেকে ফারসিদের কাছ থেকে নয়। এটি নিয়ে এখন আর কোন সমস্যা হচ্ছে না কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন শব্দে এখনো ফারসি ভাষার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সেজন্য অনেকেই রমাদান رَمَضَان মাস কে বলে রমজান মাস। কিন্তু সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াত পড়ার সময় সবাই রমাদান পড়ে কিন্তু বাংলায় মাসের নাম বলার সময় "রমজান মাস" বলে!
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে আরবি পরিভাষার পরিবর্তে যখনই আপনি ফার্সি বা অন্য কোন পরিভাষা ব্যবহার করেন তখনই সেখানে বিদআত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাঃ যে বিষয়কে যেভাবে পালন করেছেন যখনই শব্দ চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে তখনই কিছু মানুষ নিজের মত ইবাদত বন্দেগি তৈরি করে নিচ্ছে আর তাতেই বিদআত তৈরি হচ্ছে।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি যেমন 'পীর' বা মাজার শব্দ দুটি কোরআন হাদিসে কোথাও নেই এগুলো ফার্সি পরিভাষা। কুরআন মাজিদে বা আরবি ভাষায় আলিম শব্দটি জ্ঞানী হিসেবে ব্যবহার করা হয় কিছু ক্ষেত্রে উলিল আলবাব শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু যখনই পীর শব্দটি ব্যবহার করা হয় তখনই এখানে ইসলামের নামে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয় যা কোরআন হাদিসে নেই। আপনার আশেপাশে এ ধরনের যত বিদআত আছে সবগুলোই দেখবেন ফার্সি বা অন্য ভাষার পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে ।আরবি পরিভাষা ব্যবহার এ ধরনের বিদআতে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।
আরবি পরিভাষা ব্যবহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে কোরআন মাজিদের প্রতিটি হরফ উচ্চারণে দশটি করে নেকি হয় বা সওয়াব হয়। আপনি যদি আরবি পরিভাষা ব্যবহার করেন তাহলে প্রতি হরফে নেকিগুলো আপনি পাচ্ছেন। অন্য পরিভাষা ব্যবহার করলে সেই নেকি থেকে আপনি বঞ্চিত হচ্ছেন। আর আরেকটি কথা মনে রাখবেন কোরআন এবং হাদিসের পরিভাষা গুলা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তার নিজের কন্ঠে উচ্চারণ করেছেন, সাহাবীরা শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, আর আপনি সেই শব্দ ব্যবহার করছেন মানে আপনি রাসূলের অনুসরণ করছেন।
ধর্মীয় ক্ষেত্রে পরিচিত কিছু ফারসি শব্দ যার পরিবর্তে আপনি আরবি পরিভাষা ব্যবহার করতে পারেন সেগুলো উল্লেখ করছি।
নামাজ শব্দের পরিবর্তে ছলাত
কোরআন
মাজিদে এবং হাদীসে সালাত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এটি আরবি শব্দ এবং
আরবি পরিভাষা। কিন্তু বাংলা ভাষায় নামাজ শব্দটি সবার কাছে ব্যাপক পরিচিত
এবং সবাই সালাতকে নামাজ হিসাবেই জানে। আমরা জানি যে কোরআনের কোন হরফ
উচ্চারণ করলে দশটি করে নেকি হয়। তাই ধর্মীয় পরিভাষা
হিসেবে নামাজ শব্দের পরিবর্তে সলাত শব্দ ব্যবহার করা উচিত।
রোযা শব্দের পরিবর্তে সাওম
নামাজের ন্যায় রোজাও একটি ফার্সি শব্দ। এ শব্দটি ও আমাদের এই উপমহাদেশে আরবী ‘ছাওম বা ছিয়াম’ শব্দটির পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। ‘ছাওম বা ছিয়াম’ এর অর্থ হচ্ছে
বিরত থাকা,ছেড়ে দেয়া। ছাওম বা ছিয়াম ইসলামের ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি অন্যতম স্তম্ভ। “ছাওম বা ছিয়াম” শব্দ দুটি পবিত্র কুরানুল কারীমের শব্দ তাই এ শব্দ দুটি বললে ৩০ বা ৪০ টি জাযা পাওয়া যাবে ইনশা আল্লাহ্। এ শব্দগুলোও ইসলামী পরিভাষা । যেহেতু ছওম বা ছিয়াম শব্দ দুটি ইসলামী পরিভাষা তাই আমাদের উচিত রোজা শব্দের পরিবর্তে ‘ছাওম বা ছিয়াম ’ বলার অভ্যাস করা।
কোরআন শরীফের পরিবর্তে কোরআন মাজীদ
আমরা পবিত্র কুরআনুল কারীমকে কুরআন শরীফ বলে থাকি অথচ মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীমকে কুরআন শরীফ বলে কোথাও অবহিত করেন নি। তিনি কুরআনুল কারীমকে কুরআনুম মাজীদ,কুরআনুল কারীম, আল-ফুরক্বান, আল-কিতাব, আয-যিকর, আল-হাকীম, আন-নূর, আল-হাক্ব, আল-মুবীন, আশ-শিফা প্রভৃতি নামে অবহিত করছেন। তাই আমাদের উচিত মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীমকে যে নামে অবহিত করেছেন সেই নামেই অবহিত করা। অর্থাৎ কোরআন শরীফের পরিবর্তে কুরআনুল কারীম বা কোরআন মাজীদ শব্দ ব্যবহার করা।
দোজখ শব্দের পরিবর্তে জাহান্নাম
দোযখ শব্দটি আমাদের সবার নিকটই পরিচিত এটি একটি ফারসি শব্দ এর বিপরীতে কোরআন মাজিদে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হচ্ছে হচ্ছে জাহান্নাম। যেহেতু কোরআন মাজিদের প্রতিটি হরফে দশটি করে নেকি রয়েছে তাই আমাদেরকে দোযখ শব্দের পরিবর্তে জাহান্নাম শব্দ ব্যবহার করা উচিত জাহান্নাম শব্দটি কোরআন মাজিদে ৭৭ বার ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এখানে উল্লেখ্য যে জাহান্নাম শব্দটি আরবি শব্দ নয় এটি হিব্রু ভাষা থেকে আরবি ভাষায় এসেছে।
বেহেশত শব্দের পরিবর্তে জান্নাত
এই শব্দটিও ফারসি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে অর্থাৎ আমরা বেহেশত হিসাবে চিনি কিন্তু কুরআন মাজীদে এর বিপরীতে জান্নাত শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আমাদেরকে জান্নাত শব্দটি ধর্মীয়ভাবে ব্যবহার করা উচিত। জান্নাত শব্দটি কোরআন মাজিদে ১৪৭ বার ব্যবহার করা হয়েছে।
ফেরেশতা শব্দের পরিবর্তে মালাইকা
ফেরেশতা শব্দটিও ফারসি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় ব্যবহার হয়েছে তবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে আমাদেরকে ফেরেশতা শব্দের পরিবর্তে মালাইকা শব্দটি ব্যবহার করা উচিত যে দুটি কোরআন মাজীদে ব্যবহার করা হয়েছে আর এর প্রতিটি হরফে ১০টি করে নেকি রয়েছে। মালাকা বা মালাইকা শব্দটি কোরআন মাজিদে ৮৮ বার ব্যবহার করা হয়েছে।
পয়গম্বর শব্দের পরিবর্তে নবী বা রাসূল
পয়গম্বর শব্দটিও ফারসি ভাষা থেকে এসেছে আরবি ভাষায় অর্থাৎ কোরআন মাজিদে একে নবী বা রাসূল শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে রাসূল বা নবী শব্দ ব্যবহার করা উচিত যেহেতু কুরআন মাজীদ এটি ব্যবহার করা হয়েছে।
শবে কদর এর পরিবর্তে লাইলাতুল কদর
শবে কদর শব্দটি আমাদের সবার নিকটে পরিচিত। বাংলাদেশের সাধারণত রমাদান মাসের ২৭ তারিখ দিবাগত রাতে শবে কদর পালন করা হয়। তবে হাদিস অনুযায়ী রমাদান মাসের শেষ ১০ দিনের যে কোন বিজোড় রাত্রি শবে কদর হতে পারে। এই শবে কদর শব্দটি আরবি এবং ফারসি ভাষার মিলিত রূপ। শবে অর্থাৎ রাত্রি ,এটি ফারসি শব্দ আর কদর আরবি শব্দ কিন্তু কোরআন মাজিদে লাইলাতুল কদর বলা হয়েছে অর্থাৎ শবে কদরের পরিবর্তে লাইলাতুল কদর শব্দটি ব্যবহার করা উচিত। এক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই কোরআনের পরিভাষা ব্যবহার করতে হবে।
পরিশেষে
সবাইকে অনুরোধ করব ফার্সি অথবা অন্যান্য পরিভাষার পরিবর্তে ধর্মীয় ক্ষেত্রে আরবি পরিভাষার প্রচলন করা এবং সবাইকে এ বিষয়ে উৎসাহিত করা।


কোন মন্তব্য নেই