আবু জাহেলের ঈমান ও আকিদার সাথে আমাদের পার্থক্য কোথায় !
আবু জাহেলের ঈমান ও আকিদা
আবু জাহেলের নাম আমাদের সকলেরই জানা। তিনি ছিলেন মুশরিকদের নেতা এবং ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়ে নিহত হয়েছিলেন। এ পরিচয়ের বাইরেও আজকে আবু জাহেল সম্পর্কে আমি নতুন কিছু তথ্য আপনাদেরকে জানাবো ইং শা আল্লাহ। এগুলো অনেকেই জানেন, আবার কারো অজানা থাকতে পারে।
আবু জাহেলের পরিচয়
আবু জাহেলের আসল নাম হল আমর ইবনে হিশাম। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের পূর্বে তার উপাধি ছিল আবুল হাকাম অর্থাৎ জ্ঞানী বিচারের পিতা, তিনি অনেকগুলো ভাষার পন্ডিত ছিলেন এবং গভীর জ্ঞানের মানুষ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার উলুহিয়াত চিনতে না পারার কারণে বা সে জ্ঞান না থাকার কারণে তাকে আবু জাহেল (মূর্খের পিতা) হিসেবে ডাকা হয়।
আওলাদে রাসূল
আবু জাহেল ছিলেন আওলাদে রাসূল কারণ তিনি হযরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর। তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম এর চাচা ছিলেন না যেমনটা অনেক বই পুস্তকের লেখা থাকে কারণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ বংশের বনি হাশেম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন অপর পক্ষে আবু জাহেল কোরাইশ বংশের বানু মাখজুম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। আওলাদে রাসুল হলেই যে কেউ ঈমানদার হবে বিষয়টা সেরকম নয়। আমারা দেখতে পাই হযরত নুহ আঃ এর ছেলে নবীর প্রতি ঈমান আনেননি আবার হযরত লুত আঃ এর স্ত্রীও ঈমানদার ছিলেন না। সুতরাং আওলাদে রাসূল ধার্মিকতার মাপকাঠি নয় ধার্মিকতার মাপকাঠি হলো তার ঈমান এবং আমল।
বহুবার হজ সম্পন্নকারী
আবু জাহেল ছিলেন একজন আলহাজ্ব অর্থাৎ তিনি বহুবার হজ্জ সম্পন্ন করেছিলেন। যদিও এই হজ্জ ছিল তৎকালীন পদ্ধতির অর্থাৎ তারা নগ্ন হয়ে কাবার চারপাশে তাওয়াফ করে হজ্জ পালন করতেন।
আবু জাহেলের বিশ্বাস
আবু জাহেল সহ তৎকালীন মুশরিকরা আল্লাহ তালাকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানতো, রব্বুল আলামীন হিসেবে মানতো। কোরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা তুলে ধরেছেন। সূরা আনকাবুতের ৬১ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
"যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে কর্মে নিয়োজিত করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। তাহলে তারা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে?"
একই কথা বলা হয়েছে কোরআনের সূরা লোকমানের ২৫ নং আয়াতে, সূরা যুমার এর ৩৮ নং আয়াতে, এবং সূরা যুখরফ এর ০৯ নং আয়াতে।
বদর যুদ্ধের পূর্বে আবু জাহেল কাবার গিলাফ ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছিল। সে বলেছিল যদি আমরা সত্যের পক্ষে থাকি তাহলে আমাদেরকে বিজয়ী করো, আর যদি মোহাম্মদ সাঃ হকের উপরে থাকে তাহলে তাকেই বিজয়ী করুন। আবু জাহেল আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কে স্রষ্টা হিসেবে মানতো ।
এখন প্রশ্ন জাগে তাহলে আবু জাহেলের সাথে আমাদের পার্থক্য কোথায়? এ প্রশ্নটির উত্তর জানা আমাদের খুবই জরুরী কারণ এজন্যই আমাদের অনেকেই আবু জাহেলের আকিদা গ্রহণ করেছেন অথচ তিনি নিজেই জানেন না!
আসল পার্থক্য কোথায়!
আবু জাহেল আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা হিসাবে মানলেও একমাত্র ইলাহ হিসাবে মানতো না। অর্থাৎ আবু জাহেল লা রাব্বাকা ইল্লাল্লাহ, লা মালিকা ইল্লাল্লাহ, লা রাজ্জাকা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি মানলেও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হিসেবে মানতে পারেনি। সে আল্লাহকে একমাত্র ইবাদতের যোগ্য বলে মানতো না।
তৎকালীন আরবে তিনটি বড় মূর্তি ছিল তার মধ্যে একটি ছিল মানাত। এটি লোহিত সাগরের উপকূলে মুসল্লাল নামক জায়গায় স্থাপন করা হয়েছিল। আরেকটি মূর্তি ছিল তায়েফে এটি লাত নামে পরিচিত ছিল। এছাড়াও আরেকটি মূর্তি ছিল নাখোলা নামক স্থানে যা উজ্জা নামে পরিচিত । এছাড়াও হযরত নূহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের জাতির মূর্তি ওয়াদ্দা, সুয়া, ইয়াগুছ,ইয়াউক এবং নাসর আরবে নিয়ে আসা হয়। আবু জাহেল মনে করত লাত, মানাত, উজ্জা,ওয়াদ্দা, সুয়া, ইয়াগুছ,ইয়াউক এবং নাসর এ ধরনের আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতিকৃতি তৈরি করে তাদের কাছে সাহায্য চাইলে তারা আল্লাহর কাছে তার জন্য সুপারিশ করবে । এজন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন সৎ ও প্রিয় বান্দাদের ভাস্কর্য তৈরি করে তাদের নিকট সাহায্য চাইতো। তাই এ সকল মূর্তির সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের পশু মানত করত। এ ধরনের মানতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাহিরা, সায়বা, ওয়াসিলা এবং হামি।
এ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
"বাহিরা, সায়বা, ওয়াসিলা এবং হামি আল্লাহ স্থির করেননি কিন্তু কাফিররা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে এবং তাদের অধিকাংশ উপলব্ধি করে না"
সূরা (আল মায়েদা আয়াত ১০৩)
আমাদের মধ্যেও এমন অনেক মুসলিম আছেন যাদের ঈমান এবং আকিদা আবু জাহেলের ঈমান এবং আকিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা ভন্ড পীর এবং কবর-মাজারে বিশ্বাস করেন এবং মনে করেন এই ভন্ড পীররাই আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে অবশেষে জান্নাতে নিয়ে যাবে। অথচ আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কারো জন্য সেদিন সুপারিশ করতে পারবেনা। সবাই তার নিজেকে নিয়ে সেদিন ব্যস্ত থাকবে অপরের চিন্তা তার মনের মধ্যে আসবেই না।
আবার আমাদের মধ্যে এমন অনেক ঈমানদার আছেন যিনি হজ করতে গিয়ে আরাফার ময়দানের পাথর পকেটে করে নিয়ে আসেন অথবা জান্নাতুল বাকি থেকে মাটি বা বালু পকেটে করে নিয়ে আসেন এই ভেবে যে, এই মাটি বা বালু বা পাথর তিনি ঘরের ভিতরে রাখলে ঘরে বরকত আসবে, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে যাবেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, আপনার বিশ্বাস জন্মেছে যে এগুলোর মধ্যে শক্তি আছে যা আপনাকে সুস্থ করবে। আবু জাহেল এরকমই মনে করত যে আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে কারো মাধ্যম প্রয়োজন। কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা তাদের এ মনোভাব তুলে ধরেছেন।
"আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।" (সূরা যুমার আয়াত ০৩)
"তাদের কোনো সুপারিশ কাজে আসবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।"
(সূরা নাজম আয়াত ২৬)
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হাযরে আসওয়াদ সম্পর্কে বলেন যে, তিনি জানেন যে এটি একটি পাথর। এর দ্বারা উপকার বা অপকার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারপরও তিনি পাথরটিকে চুমু দিতেন কারণ তিনি রাসুল সাঃ কে তা করতে দেখেছেন তাই।
(রিয়াদুর সহলিহিন ১২/১৭১ ,সহীহ বুখারী হাদিস নাম্বার ১৫৯৭,১৬০৫, ১৬১০ সহীহ মুসলিম ১২৭০ , তিরমিজি ৮৬০)
পরিশেষে
উপরের আলোচনা থেকে আমরা এ বিষয়টি বুঝেছি যে, অনেক মুসলিমের বিশ্বাস এবং আকিদার সাথে আবু জাহেলের আকিদার খুব বেশি পার্থক্য নেই। এজন্য আমাদেরকে কোরআন মাজীদ অনুধাবন করতে হবে এবং সহীহ হাদিস জানতে হবে। তাহলে আমরা আমাদের ঈমান হবে পরিশুদ্ধ এবং আমরা সহিহ আমল করতে পারব ইং শা আল্লাহ । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন,
আমীন।
#UzzalHossain


কোন মন্তব্য নেই