আমলনামা কী?
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। প্রতিটি ক্ষণ আমাদের কর্মের ফলাফল বহন করে আনে। আমরা যা করি, যা বলি, যা ভাবি, সবকিছুই লেখা হচ্ছে আমাদের আমলনামায়। এই আমলনামা আমাদের প্রতিটি কর্মের নীরব সাক্ষী।
আমলনামা হলো একটি কাল্পনিক বই,
যেখানে মানুষের জীবনের প্রতিটি কর্ম লিপিবদ্ধ থাকে। মৃত্যুর পর এই বইটি
আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে। আমাদের সকল কর্মের হিসাব নেওয়া হবে এবং আমাদের
কর্মের ফলাফল অনুযায়ী আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করা হবে।
প্রতিটি মানুষের
সাথে দুইজন ফেরেস্থা থাকে তারা মানুষের সকল কাজ-কর্ম রেকর্ড করে। আল্লাহ বলেন,
"
إِذْ يَتَلَقَّى ٱلْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ ٱلْيَمِينِ وَعَنِ ٱلشِّمَالِ قَعِيدٌ "
“ যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে।”
(সূরা ক্বাফ আয়াত ১৭)
এই দুইজন ফেরেস্থাকে বলা হয় ”কিরামান
কাতিবিন” বা সম্মানিত লেখক। তারা আমাদের সকল কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত (সূরা ইনফিতার আয়াত ১১ ও ১২)। বিচার দিবসে যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যার আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে সে হবে জাহান্নামি।(সূরা হাক্কাহ আয়াহ ১৯ এবং ২৫)।
আখিরাতে যখন আমলনামা দেওয়া হবে তারপর বলা হবে পড় তোমার কিতাব, আজকে তোমার হিসেব
গ্রহনের জন্য তুনি নিজেই যথেষ্ট (১৭ নং সূরা বানী ঈসরাইলের আয়াত ১৪। মানুষের
আমলনামার দায়ভার একমাত্র তার নিজের অর্থাৎ যার যার কাজ কর্মের দায়ভার শুধু তাকেই বহন করতে হবে।
মানুষের নিকট আল্লাহর প্রশ্ন
এখন
প্রশ্ন হল কোন জিনিস মানুষকে তার রবের ব্যাপারে ধোকায় ফেলেছে? ইনফিতারে
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রতিটি মানুষকে এই প্রশ্নটি করেছেন? কিভাবে সে তার
রবকে ভুলে গিয়েছে অর্থাৎ কোন জিনিস মানুষকে তার রবের ব্যাপারে ধোঁকায়
ফেলেছে যে রব তাকে সৃষ্টি করেছেন, আকৃতি গঠন করেছেন এবং সুন্দর অবয়ব দান
করেছেন (সূরা ইনফিতার আয়াত ৬ এবং ৭) । সূরা ইনফিতার যদি আপনি অর্থ বুঝে
বুঝে পড়েন তাহলে আপনার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে।
আল্লাহর প্রশ্নের জবাব
উপরের
প্রশ্নের জবাব আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা মুনাফিকুন এর ৯,১০ এবং ১১ নং
আয়াতে নিজেই দিয়েছেন। মানুষ সাধারণত দুইটি জিনিসের জন্য তার রবকে ভুলে
যায় অর্থাৎ দুইটি জিনিস মানুষকে ধোকায় ফেলে তার রবের ব্যাপারে। সূরা
মুনাফিকুন এর ৯ নং আয়াতে মুমিনদেরকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন যে তোমাদের
সন্তান সন্তানাদি এবং সম্পদ যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্বরণ থেকে গাফেল না
করে। যারা এ বিষয়ে গাফেলের মধ্যে পতিত হবে তারা আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ধনসম্পদ
এবং সন্তান-সন্তানাদি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কিন্তু স্থায়ী
সৎকর্ম সমূহ পরকালের জীবনে প্রতিদান পাওয়ার জন্য উত্তম (সূরা কাহাফ আয়াত
৪৬)। মানুষেসর আত্মীয় স্বজন এবং সন্তান সন্তানাদি কেয়ামতের দিন কোন উপকারে
আসবে না সূরা মুমতাহিনা আয়াত ০৩)।
মৃত্যুর সময় একজন মানুষ কী চায়?
মানুষ
দুনিয়াতে নিজের সন্তান এবং সম্পত্তি অর্জনের জন্য তার নিজের আমলনামা নষ্ট
করছে অর্থাৎ যে আমলের বিনিময়ে সে জান্নাতে যাবে সেটি অর্জন থেকে দূরে
রয়েছে, যার জন্য জাহান্নাম তার নিকটবর্তী হয়েছে। যখন একজন মানুষের সামনে
মৃত্যু চলে আসে তখন একজন মানুষ কি চায় সে বিষয়টা সূরা মুনাফিকুনের ১০ নং
আয়াতেই তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে কারো নিকটে মৃত্যু উপস্থিত
হলে সে আল্লাহর কাছে বিনয় করে অল্প কিছু সময় চায় আর সে বলে হে আল্লাহ
আমাকে অল্প একটু সময় দিন আমি পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে আমার সকল সম্পত্তি সদকা
করে দিব এবং আমি সালেহীন বা সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। কিন্তু
আল্লাহ বলেন তাকে আর এক মুহূর্ত সময় দেওয়া হয় না। মানুষ এমন এক সময়
বুঝতে পারে যে তার সন্তান সন্তানাদি এবং সম্পদ কোনো কাজেই আসলো না। কিন্তু
তখন তার আর কিছু করার থাকে না। এজন্য সময় থাকতেই সময়ের মূল্য দিতে হবে।
নিকট আত্মীয়রা যেদিন পলায়ন করবে
মানুষের পরিবার-পরিজনের লোকজন আখিরাতে কোন কাজে আসবে না। যার যার আমলনামা
অনুযায়ী তাকে প্রতিফল দেওয়া হবে ।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ কথাটি অত্যন্ত
সুন্দর করে তুলে ধরেছেন আল্লাহ বলেন সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাইয়ের
কাছ থেকে তার মায়ের কাছ থেকে তার পিতার কাছ থেকে তার সঙ্গিনীর কাছ থেকে
এবং তার সন্তানাদির কাছ থেকে। সেদিন মানুষ শুধু তার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত
থাকবে (সূরা আবাসা আয়াত ৩৪-৩৭)। একজন মানুষের কাছে যখন তার ভাই আসবে একটি
নেকি নেওয়ার জন্য তখন সেই ভাই তাকে দেখে দৌড় দিবে যেমনি করে বনের বাঘ
দেখলে একজন মানুষ দৌড়ে পালিয়ে যায়। একইভাবে তাকে দেখে পালিয়ে যাবে তার
মা, তার বাবা, তার সঙ্গীনিরা এবং তার সন্তানরা।
বুঝার
জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি, গ্রামের এক দৌড়বিদ শহরে দৌড় খেলা দিয়ে প্রথম
স্থান অর্জন করলেন। সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরলেন এবং প্রশ্ন করলেন শহরের এত
নামিদামি খেলোয়াড়দের হারিয়ে আপনি কিভাবে দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হলেন?
তখন সেই বিজয়ী গ্রাম্য খেলোয়াড় বললেন গ্রামের মধ্যে হুইসেল বা বাশিতে
ফু দিলে আমরা দৌড় দিতাম। আজকের খেলায় আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম হঠাৎ দেখি গুলি
করা হলো আমি তো জীবন বাঁচানোর জন্য দিলাম দৌড়। এখন অন্য দৌড়বিদরা দৌড়
দিয়েছে খেলার জন্য কিন্তু আমি দৌড় দিয়েছি জীবন বাঁচানোর জন্য আর তাতেই
প্রথম হয়ে গেলাম।
মহামারি করোনা থেকে শিক্ষা
শুধু
আখিরাতের জীবন নয় বাস্তব দুনিয়ার জীবনেই আমরা দেখতে পাই মানুষ কঠিন
অবস্থায় পড়লে আপন জন দূরে চলে যায় যেমনটা মহামারী করোনা বা কোভিড ১৯
আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে। কোন নিকট আত্মীয় মারা গেলেও মানুষ তাকে দেখতে
যেত না, তার সেবা করা তো দূরের কথা। এমন অনেক মানুষও দেখেছি যারা মোবাইল
ফোনে কথা বলতে ভয় পেত যে যদি অপর প্রান্তের লোকের করোনা হয় আর মোবাইলের
মাধ্যমে যদি তার কাছে করোনা ভাইরাস চলে আসে। আবার অনেকে এমনটাও দোয়া করত
যে আল্লাহ আমাকে মৃত্যু দাও তারপরেও করোনা দিও না। কারণ সামাজিকভাবে
এতটাঅসহায় হয়ে যেত তার স্ত্রী সন্তানও তার কাছে আসে না একজন মানুষ মারা
গেলে তার জানাজায় লোকজন যাওয়ার সাহস পায় না। দুই একজ স্বেচ্ছাসেবী তার
জানাজা দেয়। এ এক মহা বাস্তবতা করোনা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতেই,
আর আখিরাতে তো রয়েই গেছে।
পরিশেষে একটি উপলব্দি
সুতরাং
সন্তান-সন্তানাদির জন্য, সম্পদের জন্য আপনি চেষ্টা করবেন কিন্তু আপনার
আমলনামা নষ্ট করে নয়। আপনি মনে রাখবেন আপনার সম্পদ সম্পত্তির ভাগ সবাই
নিবে কিন্তু আপনার আমলনামার ভাগ কেউ নিবে না । আপনার আমলনামা আপনারই থাকবে।
কি লাভ হবে যদি আপনার সন্তান সন্তানাদি অনেক সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে
পায়? সন্তানের জন্য ফ্ল্যাট বাড়ি গাড়ি করে গেলেন কিন্তু আপনার জায়গা হল
জাহান্নামে। তাহলে আপনার জীবনটাই তো ব্যর্থ হয়ে গেল। সুতরাং জান্নাত মিস
হয়ে যেতে পারে এমন কোন কাজ করা যাবে না সেটা যার জন্যই হোক। মনে রাখবেন
আল্লাহর কাছে যেতে হবে আপনাকে একা এবং বিচারের মুখোমুখি হতে হবে আপনাকে
একা। আপনার
আমলনামার দায়ভার কেউ নিবে না।
কোন মন্তব্য নেই